সুরাকা ইবনে মালিক ও কিসরার মুকুট

সুরাকা ইবনে মালিক ও কিসরার মুকুট

মক্কার কাফিররা রত্ন চিনতে ভুল করেছিল। যিনি সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য রহমত সরূপ অবতীর্ণ হয়েছিলেন, উম্মতের জন্য যিনি সীমাহীন নির্যাতন আর কষ্ট সয়েছেন সেই মুহাম্মাদের নাম নিশানা মিটিয়ে দিতে কুরাইশরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের সকল পরিকল্পনা নষ্ট করে দিলেন।
কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা দিন-দিন বেড়েই চলছে। আল্লাহ তাআলা'র পক্ষ থেকে নির্দেশ আসলো হিজরত করার। দ্বীনের জন্য নবীজি (সাঃ) আবু বকর রাদিআল্লাহু আনহু'কে সাথে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন মদীনার উদ্দেশ্যে। ঐ রাতেই অন্যদিকে মক্কার মুশরিকদের আলোচনা সভায় সিদ্ধান্ত হলো নবীজি (সাঃ) হত্যা করার। নবীজি হিজরতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার আগে আলী রাদিআল্লাহু আনহু'কে নিজ ঘরে রেখে গেলেন। কারন মক্কার কাফেররা তখনো নবীজি (সাঃ) এর কাছে অনেক মুল্যবান বস্তু আমানাত রেখেছিল। ভাবতেই অবাক লাগে, যে মুশরিকরা মুহাম্মাদের নবুয়ত স্বীকার করে না, তারাই আবার তার কাছে আমানত রাখে, বিশ্বাস করে! 
সাওর গুহা/সাওর পর্বত
সাওর পর্বত

কুরাইশরা মুহাম্মদের ঘরে তাকে হত্যা করতে এসে আলী রাদিআল্লাহু আনহু'কে দেখতে পায়। কুরাইশদের মাঝে যখন এ কথাটি ছড়িয়ে পড়লো যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় নেই তখন একদিকে যেমন কুরাইশ নেতৃবৃন্দ খবরটি বিশ্বাসই করত পারছিলনা, অন্য দিকে মক্কায় একটি ভীতির ভাবও ছড়িয়ে পড়ে। সাথে সাথে তারা বনু হাশিমের প্রতিটি বাড়ীতে তল্লাশী শুরু করে দেয়। নবীজি'র ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বাড়ী-ঘর তল্লাশী করতে করতে তারা আবু বকরের বাড়ীতে উপস্থিত হয়। তাদের সাড়া পেয়ে আবু বকরের  মেয়ে আসমা (রাঃ) বেরিয়ে আসেন। কুরাইশ নেতা আবু জাহল তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার আব্বা কোথায়?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘তিনি এখন কোথায় তাতো আমি জানিনা।’

কুরাইশদের যখন স্থির বিশ্বাস হলো যে, মুহাম্মাদ সত্যি সত্যি মক্কা থেকে চলে গেছেন, তখন তাদের অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। তারা একদল পদচিহ্ন বিশারদকে পদচিহ্ন অনুসরণ করে তাঁদের খুঁজে বের করার জন্য লাগিয়ে দেয়। পদচিহ্ন বিশারদরা ‘সাওর’ পর্বতের গুহার কাছে এসে কুরাইশদের বললো আল্লাহর কসম, তোমাদের সাথী মুহাম্মাদ স্বাল্লাল্লাহুয় লাইহি ওয়াসাল্লাম এ গুহা ছেড়ে এখনও কোথাও যায়নি।’

আসলে তাদের এ অনুমান সঠিক ছিল। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসসালাম ও তাঁর সাথী আবু বকর রাদিআল্লাহু আনহু তখনও সেই গুহার মধ্যে। আর কুরাইশরা তাঁদের মাথার ওপরে। এমন কি হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. গুহার ওপরের দিকে তাদের মাথার ওপর বিচরণকারী কুরাইশদের পা-ও দেখতে
পাচ্ছিলেন। তাঁর চোখ দু’টি পানিতে ঝাপসা হয়ে গেল।

ভালোবাসার দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসসালাম এর দিকে তাকিয়ে ফিস ফিস করে আবু বকর রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহর কসম, আমার নিজের জানের ভয়ে নয়, আপনার প্রতি তাদের কোন দুর্ব্যবহার আমাকে দেখতে হয়, এ ভয়ে আমি কাঁদছি”। তাঁকে আশ্বস্ত করে রাসূল স্বাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আবু বকর, দুশ্চিন্তা করোনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’ আল্লাহ তায়ালা আবু বকরের রাঃ অন্তরে প্রশান্তি দান করলেন।

আবু জাহল বললো, লাত ও উজ্জার শপথ, আমার মনে হচ্ছে তারা আমাদের ধারে কাছে কোথাও আছে। আমাদের কথা তারা শুনছে এবং আমাদের কার্যকলাপও তারা দেখছে। কিন্তু তার ইন্দ্রজালেও আমাদের দৃষ্টিশক্তি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তাই আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না।’ মুহাম্মদ কে খোঁজে না পেয়ে সবাই নগরিতে ফিরে গেল।
তবুও, কুরাইশরা মুহাম্মদ কে খুঁজে বের করার ব্যাপারে একেবারে হাত গুটিয়ে নিলনা এবং তাঁর পিছু ধাওয়া করার সিদ্ধান্তেও তাদের কোন নড়চড় হলো না।

মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে কতগুলো গোত্র বসবাস করত। গোত্রগুলিতে তারা ঘোষণা করে দিল, কোন ব্যক্তি মুহাম্মাদকে জীবিত বা মৃত যে কোন অবস্থায় ধরে দিতে পারলে তাকে একশ’টি উন্নত জাতের উট পুরস্কার দেয়া হবে।

সুরাকা ইবন মালিক আল-মাদলাজী তখন মক্কার অনতিদূরে ‘কুদাইদ’ নামক স্থানে তার গোত্রের একটি আড্ডায় অবস্থান করছিল। এমন সময় কুরাইশদের একজন দূত সেখানে উপস্থিত হয়ে মুহাম্মাদকে স্বাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরে দেয়ার ব্যাপারে কুরাইশদের ঘোষিত পুরস্কারের কথা প্রচার করলো। একশ’ উটের কথা শুনে সুরাকার মধ্যে লালসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। কিন্তু অন্যের মধ্যেও এ লালসা সঞ্চার হতে পারে এ ভয়ে সে কোন কথা না বলে নিজেকে সামলে নিল। 

সুরাকা আড্ডা থেকে ওঠার আগেই সেখানে তার গোত্রের অন্য একটি লোক এসে বললো, ‘একটু আগেই আমি অমুক অমুক লোককে এদিকে যেতে দেখেছি। তারা নিশ্চয়ই মুহাম্মদ ও তার সাথী আবু বকর হবে। ’ 

সুরাকা মনে মনে ভাবলো নিশ্চয় তারা মুহাম্মদ ও তার সাথাী আবু বকর ই হবে। কিন্তু সুরাকা বললো, ‘না, তা না। তারা হচ্ছে অমুক গোত্রের লোক। তাদের উট হারিয়ে গেছে তাই তারা তালাশ করছে।’ ‘তা হতে পারে’- এ কথা বলে লোকটি চুপ করে গেল।

মনে মনে তাদের পিঁছু নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো সুরাকা। কিন্তু আড্ডা থেকে এখনি উঠে গেলে অন্যদের মনে সন্দেহ হতে পারে, এ কারণে সে আরও কিছুক্ষণ সেখানে বসে থাকলো। আড্ডায় উপস্থিত লোকেরা অন্য প্রসঙ্গে আলোচনায় লিপ্ত হলে এক সুযোগে সে চুপে চুপে বেরিয়ে গেল। আড্ডা থেকে বেরিয়েই সে বাড়ীর দিকে গেলো। বাড়ীতে পৌঁছেই দাসীকে বললো, ‘তুমি চুপে চুপে মানুষে না দেখে এমনভাবে আমার ঘোড়াটি অমুক উপত্যকায় বেঁধে রাখবে।’ আর দাসকে বললো ‘তুমি এ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়ীর পিছন দিক থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেন কেউ না দেখে এবং ঘোড়ার আশে পাশে কোন একস্থানে রেখে দেবে।’

সুরাকা বর্ম পরে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হলো এবং ‍মুহাম্মদকে পাকড়াও করার জন্য দ্রুত ঘোড়া হাঁকালো, যাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ) -কে ধরে দিয়ে অন্য কেউ এ পুরস্কার ছিনিয়ে নিতে না পারে। 

সে ছিল তার গোত্রের দক্ষ ঘোড় সওয়ারদের অন্যতম। সে ছিল দীর্ঘদেহী, পদচিহ্ন বিশারদ ও বিপদে দারুণ ধৈর্যশীল। সর্বোপরি সে ছিল একজন বুদ্ধিমান কবি। তার ঘোড়াটি ছিল উন্নত জাতের। সুরাকা সামনে এগিয়ে চললো। কিছুদূর যাওয়ার পর ঘোড়াটি হোঁচট খেলো এবং সে পিঠ থেকে দূরে ছিটকে পড়লো। কিছু দূর যেতে না যেতেই ঘোড়াটি আবার হোঁচট খেলো। এবার তার অশুভ লক্ষণের ধারণা আরও বেড়ে গেল। সে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করলো; কিন্তু একশ’ উটের লোভ তাকে এ চিন্তা থেকে বিরত রাখলো।

দ্বিতীয়বার ঘোড়াটি যেখানে হোঁচট খেল সেখান থেকে সামান্য দূরে সে দেখতে পেল রাসুলাল্লাহ স্বাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর দু’সঙ্গীকে, সংগে সংগে সে তার হাত ধনুকের দিকে বাড়ালো; কিন্তু সে হাতটি যেন একেবারে অসাড় হয়ে গেল। সে দেখতে পেল তার ঘোড়ার পা যেন শুকনো মাটিতে দেবে যাচ্ছে এবং সামনে থেকে প্রচণ্ড ধোঁয়া উঠে ঘোড়া ও তার চোখ আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সে দ্রুত ঘোড়াটি হাঁকানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ঘোড়াটি এমন স্থির হয়ে গেল, যেন তার পা লোহার পেরেক দিয়ে মাটিতে গেঁথে দেয়া হয়েছে।

এবার সুরাকা বুঝতে পারে সে কোনো সাধারন ব্যাক্তির পিছনে ছুটছে না বরং বরং তিনি বিশেষ কোনো শক্তির দ্বারা নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতর অবস্থান করছেন। তাই সুরাকা নিজেকে একাজ থেকে বিরত রাখল এবং নবীজি (সাঃ) এর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলো। নবীজি সুরাকা কে ক্ষমা করে দিলেন।

ফিরে যাওয়ার সময় সুরাকা বললো, ‘আল্লাহ কসম, হে মুহাম্মাদ, আমি নিশ্চিতভাবে জানি শিগগিরই আপনার দ্বীন বিজয়ী হবে। আমার সাথে আপনি ওয়াদা করুন, আমি যখন আপনার সাম্রাজ্যে যাব, আপনি আমাকে সম্মান দেবেন। আর এ কথাটি একটু লিখে দিন।’ 

রাসূল (সাঃ) আবু বকরকে (রাঃ)-কে লিখতে বললেন। তিনি একখন্ড হাড়ের ওপর কথাগুলি লিখে তার হাতে দিলেন। সুরাকা ফিরে যাবার উপক্রম করছে, এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ‘সুরাকা, তুমি যখন কিসরার রাজকীয় পোশাক পরবে তখন কেমনে হবে?’ 

বিস্ময়ের সাথে সুরাকা বললো, ‘কিসরা ইবন হুরমুয?’ রাসূল স্বাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, কিসরা ইবন হুরমুয।’ তখন কিসরা একজনই ছিলেন। তিনি পারস্যের সম্রাট কিসরা ইবনে হুরমুয। তখনকার সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাক্তিত্বের অধিকারী। 

সুরাকা পেছন ফিরে চলে গেল। ফেরার পথে সে দেখতে পেল লোকেরা তখনও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম-কে সন্ধান করে ফিরছে। সে তাদেরকে বললো, ‘তোমরা ফিরে যাও।’ আমি এ অঞ্চলে বহুদূর পর্যন্ত তাকে খুঁজেছি। তার এ কথায় লোকেরা ফিরে গেল। মুহাম্মাদ স্বাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের খবর সে সম্পূর্ণরূপে চেপে রাখল। 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম'এর সঙ্গে সুরাকার ভূমিকা ও আচরণের খবর যখন আবু জাহলের কানে গেল সে তার ভীরুতা ও
সুযোগের সদ্ব্যবহার না করার জন্য ভীষণ তিরস্কার করলো। উত্তরে সে তার স্বরচিত দু’টি শ্লোক আবৃত্তি করলোঃ
‘আল্লাহর শপথ, তুমি যদি দেখতে আবু হিকাম, আমার ঘোড়ার ব্যাপারটি, যখন
তার পা ডুবে যাচ্ছিল, তুমি জানতে এবং তোমার কোন সংশয় থাকতো না,
মুহাম্মাদ স্বাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকৃত রাসূল- সুতরাং কে তাঁকে প্রতিরোধ করে?’ 


সময় দ্রুত বয়ে চললো। একদিন যে মুহাম্মাদ স্বাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে রাতের অন্ধকারে গোপনে সরে গিয়েছিলেন, আবার তিনি বিজয়ীর বেশে হাজার হাজার সশস্ত্র সঙ্গীসহ প্রবেশ করলেন সেই মক্কা নগরীতে। অত্যাচারী ও অহংকারী কুরাইশ নেতৃবৃন্দ, যাদের দৌরাত্মে সর্বদা প্রকম্পিত থাকতো মক্কা, ভীত-বিহ্বল চিত্তে হাজির হলো মুহাম্মাদের নিকট করুণা ভিক্ষার জন্য।

মহানুভব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, ‘যাও তোমরা সবাই মুক্ত স্বাধীন।’

এ দিকে সুরাকা ইবন মালিক চললো রাসূলুল্লাহর (সাঃ) কাছে তার ইসলামের ঘোষনা দানের জন্য। সে সঙ্গে নিল দশ বছর পূর্বে প্রদত্ত সেই অঙ্গীকার পত্রটি। রাসুলাল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তার উটনীর ওপর সওয়ার। তখন প্রতিশ্রুতি পত্রটি দেখিয়ে উচ্চস্বরে বললো, আমি সুরাকা ইবন মালিক। আর এই হলো আপনার অঙ্গীকার পত্র।’ রাসূল স্বাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘সুরাকা, আমার কাছে এসো, আজ প্রতিশ্রুতি পালন ও সদ্ব্যবহারের দিন।’

রাসূলুল্লাহর ওফাতে হযরত সুরাকা রা. ব্যথিত ও শোকাভিভূত হন। একশটি উটের লোভে যেদিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সে দিনটির কথা ঘুরে ফিরে তাঁর স্মৃতিতে ভেসে উঠতে থাকে। এখন পৃথিবীর সকল উটও রাসূলুল্লাহর স্বাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম একটি নখাগ্রেরও সমান নয়।

তিনি রাসূলুল্লাহর স্বাল্লাল্লাহুয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম সেই প্রশ্নটি বার বার আওড়াতেন, ‘সুরাকা, যেদিন তুমি কিসরার পোশাক পরবে, কেমন হবে?’ কিসরার পোশাক যে সত্যি তিনি পরবেন সে ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিলনা। সময় বয়ে চললো। ইসলামী খিলাফাতের দায়িত্ব হযরত উমার ফারুকের রা. হাতে ন্যস্ত হলো। তাঁর গৌরবমসয় যুগে মুসলিম সেনাবাহিনী ঝড়ের গতিতে পারস্য সাম্রাজ্যে প্রবেশ করলো। তাঁর পারস্যের দুর্গসমূহ তছনছ করে দিয়ে তাদের বাহিনীকে পরাজিত করে পারস্য-সিংহাসন দখল করলো। হযরত উমারের রা. খিলাফাতকালের শেষ দিকে পারস্য জয়ের সুসংবাদ নিয়ে সেনাপতি সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাসের দূত পৌঁছলেন মদীনায়। তিনি সঙ্গে নিয়ে এলেন পারস্যের গনীমাতের এক পঞ্চমাংশ।
গনীমাতের ধন-দৌলত উমারের সামনে স্তূপীকৃত করা হলে তিনি বিস্ময়ের সাথে সেদিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার মধ্যে ছিল কিসরার মণি-মুক্তা খচিত মুকুট, সোনার জরি দেয়া কাপড়, মুক্তার হার এবং তার এমন চমৎকার দু’টি জামা যা ইতিপূর্বে আর কখনও হযরত উমার রঃ দেখেননি। তাছাড়া আর ছিল বহু অমূল্য জিনিস। হযরত উমার রঃ হাতের লাঠিটি দিয়ে এই মূল্যবান ধন-রত্ন উল্টাতে লাগলেন। তারপর চারপাশে উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যারা এসব জিনিস থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে জমা দিয়েছে, নিশ্চয় তারা অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন। হযরত আলী (রাঃ) তখন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন, তিনি  বললেন, আমীরুল মু’মিনীন, আপনি বিশ্বাস ভঙ্গ করেননি, আপনার প্রজারাও ভঙ্গ করেনি। আপনি যদি অন্যায়ভাবে খেতেন, তাহলে তারাও তা করতো।

অতঃপর হযরত উমার রা. সুরাকা ইবন মালিককে ডেকে নিজ হাতে তাঁকে কিসরার জামা, পাজামা, জুতো ও অন্যান্য পোশাক পরালেন। তাঁর কাঁধে ঝুলালেন কিসরার তরবারি, কোমরে বাঁধলেন বেল্ট, মাথায় রাখলেন মুকুট এবং তাঁর হাতে পরালেন সম্রাটের বালা ইত্যাদি। 

আবু আমর বলেন, সুরাকা ইবন মালিক খলীফা ’উসমানের খিলাফতকালে ২৪ হিজরীতে ইনতিকাল করেন। কেউ কেউ বলেছেন, হযরত উসমানের পরে তিনি ইনতিকাল করেন। 

হযরত সুরাকা ইবন মালিকের এ কাহিনী ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমদও আল-বারা ইবন আযিব ও আবু বকর সিদ্দীকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। 

Previous Post Next Post