কর্ডোভার ইতিবৃত্ত : কর্ডোভায় যেদিন বৃষ্টি নেমেছিল

স্পেন, যার সাথে জরিত আছে মুসলিম জাহানের গৌরবময় আটশত বছরের ইতিহাস। স্পেনের কথা আসলেই আমাদের চোখে যে দৃশ্যটি ভেসে উঠে তা হলো কর্ডোভার জামে মসজিদ। আবু আব্দুল্লাহর অদূরদর্শিতা কারণে স্পেনের মুসলমানদের বরণ করতে হয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে করুনঘন বিভীষিকা। কট্টরপন্থী খৃস্টীয় নরপিশাচদের কবল থেকে তখন কেউই রক্ষা পায়নি। এমনকি মসজিদগুলোকেও তারা গীর্জায় রূপান্তর করে। যে মুসলিম বাহিনীর পদবজ্রে কম্পিত হয়েছিল জালিম শাসকের ভীত, আটশত বছর যারা বীরদর্পে স্পেন শাসন করেছিল, ১৪৯২ সালে আবু আব্দুল্লাহ'র অদূরদর্শিতার কারনে তাদেরকে বরণ করতে হয়েছিল এক নির্মম পরিণতি। চলুন জেনে নেই কর্ডোভা বিজয়ের এক গৌরবময় ইতিহাস- 


হিজরি প্রথম শতাব্দীতে তারিক বিন যিয়াদ লাক্কা প্রান্তরের যুদ্ধে বিজয় লাভ করার পর স্পেনের বিভিন্ন অংশে সেনাদল প্রেরণ করেন। খলিফা ওলিদ বিন আব্দুল মালিকের আযাদকৃত ক্রীতদাস মুগিস রুমীকে প্রেরণ করেন কর্ডোত অভিযানের দায়িত্ব দিয়ে। মুগীস রুমী দক্ষিণ দিক থেকে কর্ডোভায় প্রবেশে পরিকল্পনা গ্রহণ করে ওয়াদিল কাবিরের একটু দক্ষিণে 'শেকান্দো' নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন।


কর্ডোভা অধিকার করা চাট্টিখানি কথা নয়। কেননা কর্ডোভা অধিকার করতে হলে সসৈন্যে নদী অতিক্রম করে নগরের উঁচু ও শক্ত প্রাচীর কবজ করা ছাড়া কোনাে বিকল্প ছিল না। নদী ও প্রাচীর এ দুই বাধা মুজাহিদদের পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু 'বিজয় অথবা শাহাদত' এ মন্ত্রে যারা দীক্ষিত, খােদার পথের সে মুজাহিদদের পথ আগলে দাঁড়াবে এমন হিম্মত কার? আল্লাহ সাহায্য যাদের সঙ্গী সব বাধা তাদের কাছে তুচ্ছ।


মুগিস রুমির গােয়েন্দা বাহিনী শেকান্দোর কাছে এক রাখালকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অনেক গুরচত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে। রাখালের দেওয়া তথ্যে তারা জানতে পারেন যে, কর্ডোভার আমির-উমারারা যুদ্ধের ভয়ে অনেক আগেই টলেডাে পালিয়ে গেছে। শহর রক্ষার জন্য উল্লেখযােগ্য কোনাে সেনাদল নেই। গােয়েন্দা বাহিনী রাখালের কাছে প্রাচীর সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেও চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য পান। রাখালটি বলে দেয় যে, দুর্গতাে বেশ মজবুত কিন্তু তার এক অংশে একটি ছিদ্র পথ রয়েছে। এর সদ্ব্যবহার করা যেতে পারে।


কর্ডোভা জামে মসজিদ
কর্ডোভা জামে মসজিদ, স্পেন

তথ্য সংগ্রহের পর মুগিস রুমি রাতের আঁধারে কর্ডোভার দিকে সৈন্য পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আল্লাহর কী রহমত! মুজাহিদ বাহিনী মার্চ করার সাথে সাথেই সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে মুষলধারে বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে যায়। ফলে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের মাঝে ঘােড়ার খুরের ঠকঠক শব্দ ইথারে মিলিয়ে যায়। তাই মুসলিম বাহিনী কারও টের পাওয়ার আগেই বিনা বাধায় ওয়াদিল-কাবিরের সেতু অতিক্রম করেন। বৃষ্টি ও প্রচণ্ড শীতের কারণে প্রাচীরের পাহারাদাররা প্রাচীর ত্যাগ করে নিজ নিজ চৌকিতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। তাই এদিকে প্রাচীর একেবারে শূন্য পড়ে রয়েছিল। মুসলিম গােয়েন্দারা রাখালের কাছ থেকে যে ছিদ্র পথের সন্ধান পেয়েছিলেন তা এত উঁচুতে ছিল যে, তাতে পৌছাও ছিল রীতিমতাে দুষ্কর। কিন্তু জনৈক জানবাজ মর্দে মুজাহিদ এক ডুমুর গাছের সাহায্যে সে পথে উঠে যান। সেনাপতি মুগিস নিজ পাগড়ি খুলে তার এক প্রান্ত সে মুজাহিদের দিকে ছুড়ে মারেন, সে মুজাহিদ পাগড়ি ধরলে একের পর এক কয়েকজন মুজাহিদ পাগড়ি বেয়ে ছিদ্র পথে গিয়ে পৌছেন।

তারপর সম্মিলিতভাবে লাফ দিয়ে নিচে অবতরণ করে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আশেপাশের পাহারাদারদেরকে কাবু করে ফেলেন এবং পরিশেষে শহরের ফটক খুলে দেন। এভাবে উল্লেখযােগ্য কোন বাধা ছাড়াই এ শহর মুসলমানদের অধীনে চলে আসে। কর্ডোভার মানুষ শতাব্দী কালের নিপীড়ন নিষ্পেষণ থেকে রক্ষা পায়।


প্রথম যুগের মুসলমান মধ্যে সাম্রাজ্য বিস্তার বা কর্তৃত্বের বলয় প্রসার করার চিন্তা ছিল না। তাঁরা আল্লাহর বান্দাদেরকে মানুষের গােলামি থেকে মুক্তি দিয়ে আল্লাহর গােলামির ছায়ায় আনার মিশন নিয়ে অভিযানে ঝাপিয়ে পড়তেন। তাই যেখানেই মুসলমানদের বিজয়ের হেলালি নিশান উড্ডীন হতো সেখানেই প্রবাহিত হতো শান্তি ও স্বস্থির সুবাতাস। যার ফলে বিজিত সম্প্রদায় বিজেতা মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার পরিবর্তে ভালােবাসার দৃষ্টিতেই তাকাত। যেসব অঞ্চল তখন পর্যন্ত মুসলমানদের কর্তৃত্ব বলয়ের বাইরে ছিল সেসব অঞ্চলের নিপীড়িত-নিষ্পেষিত মজলুম মানবতা এ আকাঙ্ক্ষা করত যে, মুসলমানরা যেন তাদের এলাকায়ও অভিযান চালিয়ে তাদেরকে জুলুমের নিগড় থেকে রক্ষা করেন। আর স্পেনের ইতিহাসও তার বিকল্প নয়। স্পেনে মুসলিম বাহিনীর অভিযানের কারণ জানতে পড়ুন- স্পেনে মুসলিম শাসন : মুসলমানদের কাছেই যাদের সভ্যতার হাতেখড়ি 


কর্ডোভার জামে মসজিদ ইসলামী খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্মৃতিচিহ্ন। মুসলমানগণ এশিয়া থেকে নিয়ে গোটা ইউরোপ ও আফ্রিকা এখানে বসেই শাসন করতেন৷ মসজিদটি শরয়ী আইন ও সালিসের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা হতো৷ ইউরোপিয়ানরা এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে গিয়ে গর্ববোধ করতো৷ স্পেনের মুসলমানদের আবিষ্কৃত জিনিস ব্যবহার করে গোটা বিশ্ব উপকৃত হতো৷ মুসলমানদের নিয়ম-কানুন অনুযায়ী পুরো দুনিয়া চলতো৷


মুসলমানগণ তখন উন্নতির চরম শিখরে পৌছেছিলো। এই মসজিদে তাফসীরে কুরতুবী লিখক কুরতুবীর তাফসীর চলতো, ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া অন্দুলুসীর দরস হতো, ইবনে হাযাম যাহেরীর ফিকহী প্রবন্ধ পাঠ করা হতো, ইবনে আরাবী তাসাউফের সুক্ষ্ম ও জটিল বিষয়াদী বর্ণনা করতেন এবং বাকি ইবনে মাখলাদের মতো ব্যক্তিত্ব এখানে বসে হাদীস বর্ননা বলতেন৷


১২৩৬ সালে ক্যাসলের রাজা তৃতীয় ফার্ডিনান্দ ও রাণী ইসাবেলা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করে স্পেন দখল করে নেয় আর মসজিদটিকে রোমান ক্যাথলিক গির্জায় রুপান্তরিত করে৷ সেখানে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষেধ। কেউ যেন রুকুও না করতে পারে, সেজন্য বিভিন্ন স্থানে সিকিরিউটি লোক রাখা হয়েছে৷ ২০১০ সালে এক দল মুসলিম পর্যটক শুধু রুকু করতে অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন৷[২]


 

তথ্যসুত্রঃ 
১. স্পেনের কান্না/মুফতি তাকি উসমানী  
২. সময় টিভি নিউজ
ট্যাগঃ কর্ডোভা মসজিদ/স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাস/স্পেনে মুসলিম সভ্যতা/স্পেনের করডোভার বর্তামান অবস্থা
Previous Post Next Post