হাজরে আসওয়াদের ইতিহাস : কেরামতিদের দৃষ্ঠতা

কেরামতি বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলাে আবু তাহের সুলায়মান কেরামতি। তার বাবা আবু সাঈদ জানাবী ৩০১ হিঃ তার এক খাদেমের হাতে নিহত হয়। আবু তাহের ভাইদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হয়েও তার বড় ভাই সাঈদের ওপর এমন অত্যাচার করতাে যে, একসময় সাঈদ প্রায় পাগল হয়ে গেলাে এবং শারীরিকভাবে হলাে প্রায় পঙ্গু। আবু তাহের বাপের আসন দখল করলাে। পারিবারিকভাবে আবু তাহেরের বড় এক সাম্রাজ্য ছিলাে। তায়েফ, বাহরাইন এবং হিজরের মতাে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত ছিলাে। আবু তাহের তার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নবী দাবী করে বসলাে। পরবর্তীতে ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, কেরামতিরা তাতারি ও উবাইদুল্লার চেয়ে ইসলামের জন্য অনেক বেশি ধ্বংসশীল ছিলাে।

দশ বছর পর্যন্ত আবু তাহের তার নবীত্বের প্রচারণা চালালাে এবং ফৌজও তৈরী করলাে। এক রাতে সে এক হাজার সাতশ ফৌজ নিয়ে বসরা হামলা করতে গেলাে। সঙ্গে করে লম্বা লম্বা কতগুলাে সিঁড়ি নিয়ে গেলাে। শহরের প্রাচীরের সঙ্গে সিড়িগুলাে লাগিয়ে হামলাকারীরা ভেতরে ঢুকলাে। আচমকা হামলায় লােকজন পালাতে লাগলাে। আবু তাহেরের হুকুমে শহরের দরজা খুলে দেয়া হলাে। লােকেরা দরজার দিকে ছুটতে শুরু করলাে। দরজাগুলােতে কেরামতিরা খােলা তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলাে। পাইকারী দরে ওরা পলায়নরত পুরুষদের হত্যা করতে শুরু করলাে। নারী আর শিশুদের বন্দী করতে লাগলাে। সরকারি অর্থভাণ্ডারসহ সারা শহর লুটে নিলাে ওরা। একরাতে বসরাকে খুনের দরিয়া বানিয়ে কেরামতিরা তাদের কেন্দ্রীয় শহর হিজরে চলে গেলাে।

হাজরে আসওয়াদের ইতিহাস ও কেরামতিদের দৃষ্ঠতা
হাজরে আসওয়াদ ও কেরামতিদের দৃষ্ঠতা
সে বছরই কেরামতিরা হাজিদের কাফেলা লুটতে শুরু করলাে। কেরামতিরা শুধু লুটপাট করতাে না, কাফেলার লােকদেরকে হত্যাও করতাে। হজ্জ থেকে ফিরে আসা হাজীদেরও তারা লুটপাট করে। সে বছর হাজারখানেক হাজীকে তারা শহীদ করলাে। কেরামতিয়াদের শায়েস্তার জন্য তদানীন্তন খলীফা বিভিন্ন এলাকায় সৈন্যদল পাঠালেন। কিন্তু সবখানেই খলীফার লশকর কেরামতিয়াদের কাছে পরাস্ত হলাে। খলীফা অনবরত সেনাসাহায্য পাঠালেন কিন্তু কেরামতিয়ারা এত তৎপর ও ক্ষিপ্র ছিলাে যে, খলীফার লশকর কোথাও তাদের টিকিটিরও নাগাল পেলােনা। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ যা পাওয়া যেতাে আবু তাহের তার সবই করামতিয়াদের মধ্যে বন্টন করে দিতাে। বিভিন্ন শহর থেকে যত যুবতী মেয়ে পাকড়াও করা হতাে তাও সবার ভােগে দিয়ে দেয়া হতাে। মদগাজা সেবন করতে পারতাে ওরা খােলা ময়দানে। এজন্য কেরামতিয়ারা আবু তাহেরের ইশারায় যে কোন সময় জান দিতে প্রস্তুত থাকতাে। নিজেদেরকে ওরা মুসলমান আর তাহেরকে বলতাে নবী।

পরবর্তী খলীফাদের পার্থিব মােহ, ভােগবিলাস ও পরকাল বিমুখতার কারণে খেলাফতে রাশেদার সেই পবিত্রতা ও আত্মত্যাগী দৃঢ়তা ক্রমেই ম্নান হয়ে পড়ে। খেলাফতের ফৌজে খােলাফায়ে রাশেদীনের ফৌজের মতাে সেই সঙ্চরিত্রতা, শাহাদাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা, বিজয় স্পৃহা কোথায় যেন চলে গিয়েছিলাে। একটা সময় ছিলাে যখন চল্লিশ হাজার মুজাহিদ দ্বিগুণ শক্তিধর সােয়ালক্ষ অগ্নিপূজক বাহিনীকে অতিসহজেই পরাস্ত করে। অথচ এখন খেলাফতের দশ হাজার সৈন্য মাত্র এক হাজার কেরামতিয়ার কাছেও পরাস্ত হচ্ছে।

আবু তাহের হিজর শহরকে তার কেন্দ্রীয় রাজধানী বানিয়ে সেখানে আড়ম্বরপূর্ণ একটি মসজিদ নির্মাণ করায়। মসজিদের কাজ শেষ হলে আবু তাহের তা দেখতে এসে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলে আমার কেরামতি ভায়েরা। ইসলামের আসল ধ্বজাধারী তােমরাই। ওরা মুসলমান না যারা কেরামতী নয় এবং যারা আমাকে নবী মানে না। খােদা আমাকে হুকুম দিয়েছেন এখন থেকে মক্কায় হজ্জ হবে না, এখানে হিজরে হজ্জ অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য জরুরী কাজ হলাে, মক্কা থেকে 'হজরে আসওয়াদ' উঠিয়ে এনে এখানে স্থাপন করা।

এক লােক উঠে দাঁড়িয়ে বললাে তাহলে আমরা হজরে আসওয়াদ এখানে কি করে আনবাে? আহলে সুন্নতরা তাে সেই দুঃসাহসের সুযােগ আমাদেরকে দেবে না। তখন আমরা করণীয় কি করবাে?

আবু তাহের বললাে, 'তােমাদের তলােয়ার কি তবে ভােত হয়ে গেছে? আহলে সুন্নতীদের রক্তে কোন জায়গা আমরা ভাসাইনি? তােমরা কাবায় ওপর অস্বীকারকারীদের রক্ত ঝরাতে পারবে না? এ বছর আমরা মক্কায় হজ্জের সময় গিয়ে কাবার এমন অবস্থা করবাে এরপর আহলে সুন্নতরা আর কখনাে মক্কার দিকে তাকাবে না।

৩১৭ হিজরীতে আবু তাহের মক্কাশরীফে গেলাে। হাজীদের কেউ তখন কাবা শরীফ তাওয়াফ করছিলাে, কেউ নামায পড়ছিলাে। আবু তাহের হাতে তলােয়ার নিয়ে ঘােড়াসহ মসজিদে হারামে প্রবেশ করলাে। তারপর শরাব আনিয়ে ঘােড়ায় বসে শরাব পান করলাে। আবু তাহেরের শরাব পান করার সময় ঘােড়াটি হঠাৎ মসজিদে প্রস্রাব করে দিলাে।

আবু তাহের তা দেখে হাে হাে করে হেসে উঠে বললাে দেখলে তােমরা। আমার ঘােড়াও আমার ধর্ম বােঝে।

মসজিদে যেসব মুসলমান ছিলাে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেলাে। তারপর যে যার মতাে প্রতিবাদ শুরু করলাে। হাজীরা দৌড়ে এলাে। সবাই তখন ইহরাম পরিহিত থাকায় নিরন্ত্র ছিলাে। আবু তাহেরের ইশারায় কেরামতিয়ারা হাজীদের পাইকারীভাবে হত্যা শুরু করলাে। কাবার আঙ্গিনায় গিয়েও সে মানুষ হত্যা করতে লাগলাে। তার হুকুমে কাবা শরীফের পবিত্র দরজা ভেঙ্গে উপড়ে ফেলা হলাে।

'আমি খােদা' আবু তাহের ঘােড়ায় থেকে ঘােষণা করলাে - 'সমন্ত সৃষ্টির ওপর আমার বন্দেগী করা ফরজ। হে পাপীর দল! তােমাদের কুরআন বলেছে, যে মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। কোথায় সে নিরাপত্তা? যাকে ইচ্ছা তাকে আমি জীবিত রেখেছি, আর যাকে চেয়েছি খুনের দরিয়ায় তাকে গােসল করিয়েছি।

এক হাজী সামনে বেড়ে আবু তাহেরের ঘােড়ার লাগাম ধরে বললেন, মিথ্যাবাদী! তুই তাে এই আয়াতের ভুল অর্থ করেছিস। এর প্রকৃত অর্থ হলাে যে মসজিদে হারামে ঢুকে পড়বে তাকে নিরাপত্তা দাও। তার ওপর হাত উঠিয়াে না।

সে হাজীর পেছন থেকে একটি তলােয়ার নড়ে উঠলাে এবং তার মস্তক দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেলাে।

তখন মক্কার আমীর ছিলেন আবু মাহলাব। কেরামতিয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মতাে তার কাছে যথেষ্ট পরিমাণ ফৌজ ছিলাে না। তিনি তার সঙ্গে কিছু অস্ত্রসজ্জিত লােক নিয়ে আবু তাহেরের কাছে গেলেন। বললেন আবু তাহের হাজীদের হত্যা বন্ধ করাে। আল্লাহর আযাবকে ভয় করাে। না হয় এই দুনিয়াতেই এর শাস্তি তুমি পাবে।' 

একে আল্লাহর আযাব দেখিয়ে দাও' - আবু তাহের হুকুম করলাে। একদল কেরামতী আবু মাহলাব ও তার সঙ্গীদের ওপর টুটে পড়লাে। আবু মাহলাবের লােকেরা পা জমিয়ে লড়ে গেলেও সংখ্যায় ওদের তুলনায় একেবারে হাতে গােনা হওয়ায় সবাই শহীদ হয়ে গেলাে অল্প সময়ের মধ্যেই।

কাবার ওপর থেকে 'মীযাব' বা স্বর্ণের যে নালাটি ছিলাে তা খুলে আবু তাহেরের পায়ে যেন রাখা হয় এই হুকুম ঘােষিত হলাে।

কাবায় চড়ে বসলাে এক কেরামতি। ইতিহাস-উদ্ধৃত মুহাম্মদ ইবনে রবী নামে এক লােক তখন অনেক দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিলেন। মুহাম্মদ ইবনে রবী আকাশের দিকে হাত তুলে বললেন 'হে আল্লাহ! আপনার সহনশীলতা ও ক্ষমা পরায়ণতার কোন অন্ত নেই, তাই বলে আপনার সুমহান জাত এই লােককেও ক্ষমা করে দেবে?' মুহাম্মদ ইবনে রবী পরে মুসলমানদের বলেছেন, যে কেরামতি কাবা শরীফে চড়েছিলাে কিভাবে জানি হঠাৎ করে সে উপুড় মুখ হয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ে মরে গেলাে।

আবু তাহের প্রচণ্ড রেগে গিয়ে আরেক কেরামতিকে কাবা শরীফে চড়তে বললাে। সে লােক প্রায় উঠেই গিয়েছিলাে। হঠাৎ তার হাত ছুটে গিয়ে পড়ে মরে গেলাে। আবু তাহের এবার আরাে রেগে গিয়ে আরেক কেরামতিকে হুকুম দিলো। এই তৃতীয় কেরামতি এ হুকুম শুনতেই ভয়ে কাঁপতে শুরু করলাে এবং আচমকা দৌড়ে পালিয়ে গেলাে।

এবার আবু তাহেরের ওপর অন্যরকম প্রতিক্রিয়া হলাে। তার মুখ দিয়ে কথা সরলাে না। কিছুক্ষণ সে কাবা শরীফের দিকে তাকিয়ে রইলাে। মনে হচ্ছিলাে সে দ্বিধাৰিত। কিন্তু শয়তান তাকে এতই কাবু করে রেখেছিলাে যে আচমকা সে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলাে। হুকুম দিলাে কাবা শরীফের গিলাফটি যেন টুকরাে টুকরাে করে ফেলা হয়।

কেরামতিরা গিলাফের ওপর হামলে পড়লাে এবং তলােয়ারের আঘাতে আঘাতেনতা টুকরাে টুকরাে করে পুরাে লশকরের মধ্যে বণ্টন করে দিলাে। কাবা শরীফের সমস্ত সম্পদ আবু তাহের নিয়ে নিলাে। যেসব হাজী পাইকারী হত্যা থেকে বেঁচে গেলাে ইমামের নেতৃত্ব ছাড়াই তারা হজ্জের ফরজ আদায় করলাে।

আবু তাহের 'হজরে আসওয়াদ' তার রাজধানী হিজরে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলাে। তখন ছিলাে রাত। বেঁচে যাওয়া হাজীরা কোনভাবে জানতে পারলাে আবু তাহের হাজরে আসওয়াদ ছিনতাই করে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। রাতে রাতেই তারা এত ভারী একটি বিশাল পাথর সেখান থেকে উঠিয়ে মকার উপত্যকার নিম্ন অঞ্চলে নিয়ে লুকিয়ে ফেললাে। সেখানে চারদিকেই কেরামতিরা সশস্ত্র প্রহরায় ছিলাে। এর মধ্যে এত বড় ভারী একটি পাথর সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা অলৌকিক কাণ্ডই ছিলাে। পরদিন সকালে আবু তাহের হুকুম দিলাে 'হজরে আসওয়াদ' উঠিয়ে নিয়ে এসাে। তাকে জানানাে হলাে সেখানে পাথর নেই। সে বললাে,এটা অত্যন্ত ভারী পাথর। আমাকে এটা বলাে না যে, কোন মানুষ এটা সেখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে।

তাকে আবারও বলা হলাে সেখানে পাথর নেই। সে এবার নিজে গিয়ে দেখলাে সেখানে সত্যিই পাথর নেই। প্রচণ্ড রাগে পাথর খুঁজে বের করতে হুকুম দিলাে সে। হাজীরা হজ্জ শেষে সেখান থেকে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাে। কিছু চলেও গিয়েছিলাে। কেরামতিরা উপস্থিত হাজিদেরকে পাথর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাে। যারা জানিনা বলে অজ্ঞতা প্রকাশ করলাে তাদের তারা হত্যা করলাে।

খুঁজতে খুঁজতে তারা হাজরে আসওয়াদ পেয়ে গেলাে। আবু তাহের তখনই তা উটে সওয়ার করিয়ে হজরে আসওয়াদ পাঠিয়ে দেয়ার হুকুম করলাে। এ ঘটনা ঘটে ৩১৭ হিজরীর যিল হজ্জ মাসের শনিবার দিন।

আবু তাহের 'যমযম' কূপও ধ্বংস করে দেয়। এ সময়েই মিসরে উবাইদুল্লার উত্থান হয়। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলাে আবু তাহের কেরামতি উবাইদুল্লাকে ইমাম মেহদী বলে মেনে নেয়। আবু তাহের হজরে আসওয়াদটি হিজরে নির্মিত তার মসজিদের দক্ষিণ পাশে স্থাপন করে উবাইদুল্লাকে এই বলে চিঠি লিখে যে আমি হুকুম দিয়ে দিয়েছি, জুমআর খুতবায় যেন আপনার নামও নেয়া হয়। এরপর সে মক্কায় কাবা শরীফে কেমন ধ্বংসক্রিয়া চালিয়েছে, আহলে সুন্নতের রক্তে কি করে মক্কার অলিগলি ভাসিয়ে দিয়েছে, খুব গর্ব করে তাও লিখে জানায়। এই চিঠিতে সে মুসলমান ও আহলে সুন্নতকে সন্ত্রাসী ও অপদস্থ জাতি বলে উল্লেখ করে।

তার আশা ছিলাে চিঠি পেয়ে উবাইদুল্লা বেশ খুশি হবে। কিন্তু কাসেদ (পত্রদূত) যখন চিঠির জবাব নিয়ে এলাে সে হতভম্ব হয়ে গেলাে। উবাইদুল্লা লিখলাে তুমি চাচ্ছে তােমার এই নােংরা কাজের আমি প্রশংসা করবাে? তুমি কাবা শরীফের অপদস্থ করেছে এবং এত পবিত্র এক স্থানে মুসলমানদের খুন ঝরিয়েছাে। না জানি কোথা কোথা থেকে হাজীরা এসেছিলাে, তাদেরকে হত্যা করেছে এবং হাজরে আসওয়াদ উপড়ে নিয়ে এসেছাে। এটাও চিন্তা করলে না হজরে আসওয়াদ আল্লাহর এক আমানত যা একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়েছিলাে। উবায়দী জামাত তােমার ওপর কুফরীর ফতােয়া আরােপ করছে। তাই তােমাকে কোন পুরস্কার দিতে পারছিনা আমরা।

আবু তাহের চিঠি পড়ে ক্ষেপে গেলাে এবং ঘােষণা করলাে কোন কেরামতি যেন উবাইদুল্লাকে ইমাম মেহদী না বলে।

প্রায় দশ বছর- ৩১৭ হিঃ থেকে ৩২৭ হিঃ পর্যন্ত মক্কায় হজ্জব্রত পালিত হয়নি। কেরামতিয়াদের ভয়ে এবং সেখানে হজরে আসওয়াদ না থাকায় কেউ সে সময় হজ্জে যায়নি। আবু আলী উমর নামে আবু তাহেরের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাে। আবু তাহেরকে আবু আলী একদিন বললাে, 'ভেবে দেখাে আবু তাহের! দশ বছর ধরে হজ্জ বন্ধ। এর কারণ তুমি জানাে। শুধু তােমার অন্যায় অত্যাচারের কারণে মুসলমানরা হজ্জের ফরয আদায় করতে পারছে না। এ কারণে তােমার দলের সাধারণ লােকেরাও ক্ষুব্ধ। আমার মতে হাজীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাে আর তাদের কুরবানীর জন্য আনা প্রত্যেক উটের ব্যাপারে পাঁচ দীনার করে ট্যাক্স নির্ধারণ করাে।

এই প্রস্তাব আবু তাহেরের বেশ পছন্দ হলাে। কাসেদের মাধ্যমে সবখানে সে ঘােষণা করালাে আগামী থেকে এত দীনারের বিনিময়ে সবাই নিরাপদে হজ্জ করতে পারবে। ইবনে খালদুন লিখেছেন, খলীফার পররষ্ট্র সচিব মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুতও আবু তাহেরকে লিখেছিলাে, হাজীদের ওপর তােমার জুলুম অত্যাচার বন্ধ করাে। হাজেরে আসওয়াদ ফিরিয়ে দাও। আর যেসব এলাকা এখন তােমার দখলে রয়েছে তা তােমারই থাকবে। এ ব্যাপার খেলাফত তােমাদেরকে শত্রু মনে করবে না।

এর জবাবে আবু তাহের নিশ্চয়তা দিলাে, ভবিষ্যতে কেরামতিরা কারাে হজ্জ আদায়ে বিঘ্ন ঘটাবে না কিন্তু হাজরে আসওয়াদ ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করলাে আবু তাহের। সে ভেবেছিলাে হাজরে আসওয়াদের আকর্ষণে লােকেরা আস্তে আস্তে তার হিজর শহরেই হজ্জ করতে আসবে। কিন্তু দশ বছরের মধ্যে একজন মুসলমানও সেমুখাে হয়নি।

খলীফা মুকতাদির বিল্লা আবু তাহেরকে পঞ্চাশ হাজার দেরহাম দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে হজরে আসওয়াদ ফিরিয়ে দিতে বলেন। আবু তাহের তা সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান করে দেয়।

এরপর খলীফা মুতী বিল্লা যখন ৩০ হাজার দীনার আবু তাহেরকে দেয়। সে হাজরে আসওয়াদ ফিরিয়ে দেয়। ৩৩৯ হিঃ ১০ মুহররম মঙ্গলবার দিন শাব্বীর ইবনে হুসাইন কেরামতি নামে আবু তাহেরের এক লােক হাজরে আসওয়াদ নিয়ে মক্কায় পৌছে। সেদিনই সেটা স্বস্থানে রেখে দেয়া হয়। খলীফা এর আশে পাশে প্রায় ১৪ কেজি রুপা গালিয়ে বেষ্টনী তুলে দেয়। চার দিন কম একাধারে বাইশ বছর আবু তাহের কেরামতির কাছে হাজরে আসওয়াদ দখলভুক্ত থাকে।

মক্কা থেকে হিজরে হাজরে আসওয়াদ বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় চল্লিশটি উট মারা যায়। অথচ হিজর থেকে মক্কায় আনার সময় একটি উটই হজরে আসওয়াদ বয়ে নিয়ে আসে এবং সে উটটি আবার সুস্থ দেহেই হিজর ফিরে যায়। অথচ পাথরের ওজন যা ছিলাে এখনাে তাই আছে। উটটিও তেমন অস্বাভাবিক ধরনের বিশালকায় ও শক্তিশালী ছিলাে না।

আল্লাহ তাআলা আবু তাহেরের জীবনরশি অনেক দীর্ঘ করেছিলেন। হাজরে আসওয়াদ ফিরিয়ে দেয়ার পর এই রশি খাটো হতে থাকে। ওদিকে হাজরে আসওয়াদ মক্কায় পৌছে এদিকে আবু তাহের ভয়াবহ বসন্ত রােগে আক্রান্ত হয়। এরােগে সে দীর্ঘ দিন ভুগে। যেই তাকে দেখতে যেতাে কানে হাত রেখে সেখান থেকে দ্রুত পালিয়ে আসতাে।

কিছু কিছু কেরামতি এ অবস্থা দেখে তাওবা করে আহলে সুন্নতে ফিরে আসে। দিন রাত তার মুখ দিয়ে গা চমকানাে মরণ চিতকার বেরােতাে। অনেক দূরেও তার দেহের দুর্গন্ধে টেকা যেতাে না। একদিন সে এভাবে তার নাপাক দুর্গন্ধময় শরীর রেখে দুনিয়া ত্যাগ করে।

পাকিস্তানের মুলতানে কেরামতিরা তাদের ঘাটি বানিয়েছিলাে। সুলতান মাহমুদ গজনবী হিন্দুস্তান হামলার সময় জানতে পারেন মুলতান কেরামতিয়াদের দখলে। কেরামতিয়ারাও তার পথরােধ করে দাঁড়ায়। তিনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। একজন সিপাহীর মতাে সারা দিন লড়াই করেন তিনি। তার তলােয়ার এত শত শত কেরামতির রক্ত ঝরায় যে, দিন শেষে বােঝার উপায় ছিলাে না কোনটা তলােয়ার আর কোনটা তার হাত। মুলতানের প্রতিটি রাস্তা অলি গলি প্লাবনের মতাে রক্তবন্যায় ভেসে যায়।

কেরামতিরা আহলে সুন্নতের যে রক্ত ঝরিয়ে ছিলাে সুলতান মাহমুদ তার চরম প্রতিশােধ নিয়েছিলেন। কেরামতিদের শিকড় উপড়ে ফেলেছিলেন তিনি।

তথ্যসূত্রঃ
১। ফেরদৌসে ইবলিস/এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
Powered by Blogger.