স্পেনে মুসলিম শাসন : স্পেন বিজয় (পর্ব - ৩)

তারিফের এ সংবাদের ভিত্তিতে ৮ রজব ৯২ হিজরি মােতাবেক ৩০ এপ্রিল ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে মুসা বিন নুসায়ের স্পেনে একটি অভিযান প্রেরণ করেন। মুসলিম বাহিনীতে ৩০০ আরব ও ৭০০০ বার্বার সৈন্য ছিল। এ দলের অধিনায়ক ছিল তারিক বিন যিয়াদ। পরবর্তীতে তার সৈন্যসংখ্যা ১২০০০ এ উন্নীত হয়। তারিক বিন যিয়াদ মরক্কোর দক্ষিণ উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক সাগর সংযােগকারী প্রণালি নৌযানের সাহায্যে অতিক্রম করে স্পেনের উত্তরাংশের পার্বত্য অঞ্চলে অবতরণ করেন। এরপর এ পাহাড়টিকে পরবর্তী আক্রমণের ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করে উপকূলীয় পথে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হন। এ পথে তিনি কারতােজা ও লাগুন-দে-জান্দা অধিকার করেন। এ অঞ্চলের গভর্নর ছিলেন থিওডমির। তিনি তারিক বিন যিয়াদের সাথে পেরে না উঠে রডারিককে মুসলিম বাহিনী আক্রমণের সংবাদ দেন। এ সংবাদ পেয়ে আতঙ্কিত রডারিক অতি দ্রুত অন্যান্য রাজ্যের সামন্ত নৃপতিদের সেনাদের সমন্বয়ে গঠিত লক্ষাধিক সদস্য সম্বলিত এক বিশাল বাহিনী তৈরি করেন। একদিকে সত্যের সৈনিক, ঈমানের বলে উদ্দীপ্ত, আত্মপ্রত্য়ী, নিভৃত মুজাহিদবাহিনী। অন্যদিকে রডারিকের জোরপূর্বক সংগৃহীত ক্রীতদাস ও যুদ্বে অনভ্যস্ত সৈন্যদল। তা ছাড়া তারিক বিন যিয়াদ যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে সৈন্যদের উদ্দেশে এক জালাময়ী ভাষণ দেন। তিনি ঘােষণা করেন।

স্পেনে মুসলিম শাসন
গ্রানাডা ( image source: https://wallpapercave.com/w/wp2454340)

দেখাে! সামনে ইসলামের শত্রু, পেছনে বিশাল সাগর, আল্লাহর শপথ পালাবার কোনাে পথ নেই। মজলুম জনতাকে রক্ষা করা ও সত্য প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ জিহাদ। আমাদের জয় অবশ্যম্তাবী....

সৈন্যরা সেনাপতির ভাষণের জবাবে বলেন, "আমরা বিজয় না পাওয়া পর্যন্ত জিহাদ অব্যাহত রাখব। ইনশাআল্লাহ। কারণ আমরা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

যা হােক এরপর ৯২ হিজরির ২৭ রমজান মােতাবেক ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের ১১ মে ওয়াদি লাক্কার উপত্যকায় (Rio-Barbate) লাগুন-দে-জান্দা নদীর তীরে মেডিনা ও সিডনিয়া শহর ও হ্রদের মধ্যবর্তী স্থানে তারিক ও রডারিক বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধ সাতদিন স্থায়ী হয়। মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের মুখে খ্রিষ্টান বাহিনী ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। হাজার হাজার গথিক সৈন্য মৃত্যুবরণ করে। রাজা রডারিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করতে গিয়ে নদীতে নিমজ্জিত হয়ে মারা যায়। তারিকের বিজয় আইবেরীয় উপদ্বীপে মুসলিম সাম্রাজ্যের ভিত্তি তৈরি করে। ইউরােপে ইতিহাসে সংযােজিত হয় এক নতুন অধ্যায়। অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরােপ প্রবেশ করে আলাের ভুবনে।

স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাসঃ স্পেন বিজয়ের বীরত্বের কাহিনী
Umabi caliphate (Source image: https://en.m.wikipedia.org/wiki/Islam_in_Spain#/media/File%3ACaliphate_740-en.svg)
তারিক বিন যিয়াদ উত্তর আফ্রিকার সেনাপতি মুসা বিন নুসায়েরকে শত্রুপক্ষের মারাত্মক পরাজয় ও নিজের বিরাট সাফল্যের কথা এবং স্পেনের সার্বিক অবস্থা জানান। সেনাপতি মুসা এ খবর পেয়ে তারিকের কাছে একটা বার্তা প্রেরণ করেন। তাতে তারিককে নির্দেশ করা হয়েছিল, "সেনাপতি মুসা না আসা পর্যন্ত যেন আর কোনাে অভিযান না চালানাে হয়।"

কিন্তু দূরদর্শী তারিক পরিস্থিতি বুঝে ও ভবিষ্যৎ পরিণাম পর্যালােচনা করে সামনের অভিযানের জন্য একটা পরিকল্পনা তৈরি করেন। কালক্ষেপণ না করে সে পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান অব্যাহত রাখেন। কারণ, দেরি করলে পরাজিত খ্রিষ্টানরা সৈন্য সংগ্রহ করে আবার আক্রমণ করতে পারে। এভাবে তারিক একের পর এক স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর বন্দর দখল করতে থাকেন। তিনি এলভিরা, আর্কিডােনা ও এচিজা দখল করেন। বিনা বাধায় টলেডাের পতন হয়। ভ্যালেন্সিয়া ও আলমেরিয়ার মধ্যবর্তী এলাকাও মুসলমানদের অধিকারে আসে। এ সময় মুগিস নামক সেনানায়কের নেতৃত্বে ৭০জন অশ্বারােহীর একটি দল কর্ডোভা নগরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। নগর প্রাচীরের ছিদ্রের সন্ধান এক রাখাল ছেলেই তাদের দেয়। এই ছিদ্র দিয়ে বেয়ে অত্যন্ত কৌশলে এক মুজাহিদ প্রাচীরে উঠে পড়ে এবং প্রাচীরের পাশে একটা গাছের সাহায্যে নিচে নেমে পড়ে। পরে তাকে অনুসরণ করে আরও কয়েকজন সৈনিক উঠে সবাই একযােগে প্রহরীদের ওপর আক্রমণ করে। তন্দ্রাচ্ছন্ন ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় প্রহরীরা ভড়কে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে নগরীর প্রবেশ দ্বার খুলে দেয়। ফলে মুসলিমবাহিনী তিরবেগে নগরে প্রবেশ করে। ফলে শহরের প্রায় সবাই আত্মসমর্পণ করে। এভাবে কর্ডোভাও মুসলমানদের শাসনে আসে। এদিকে তৃতীয় বাহিনী পূর্ব স্পেনের মালাগা ও অরিহিউলা জয় করে থিয়ােডমির শাসিত দক্ষিণ-পূর্ব স্পেনও মুসলমানেরা জয় করে। থিয়ােডেমিরের বাহিনী মুসলমানদের সাথে লড়াই করে বেশিদিন টিকে থাকতে পারে নি। মুরসিয়া পতনের পর থিয়ােডমিরের আর কোানাে সৈন্য ছিল না। তাই তিনি অরিহিউলাতে আশ্রয় নিয়ে এক অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করেন। নগরীর নারীদের পুরুষসৈন্য সাজে সজ্জিত করে সামরিক কায়দায় নগরপ্রাচীরের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। মুসলিমবাহিনী নগরের অদূরে তাঁবু স্থাপন করেছিল। তারা এই ভেবে বিস্ময় বােধ করল যে, 'নগরে এখনাে অনেক সৈন্য আছে। ইতােমধ্যে থিয়ােডমির আরও একটি কৌশল কাজে লাগালেন, সে নিজেই দূতবেশে মুসলিম সেনাপতির কাছে গিয়ে প্রস্তাব করলেন,

"নগরবাসীর জান-মালের নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হয় তাহলে আগামীকাল আপনাদের কাছে নগর অর্পণ করা হবে। নতুবা একটি লােক জীবিত থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। মুসলিম সেনাপতি স্বাভাবিকভাবেই রক্তের পরিবর্তে আনুগত্য ও জুলুমের পরিবর্তে ইনসাফ পছন্দ করেন। তাই দূতের প্রস্তাবে রাজি হয়ে সন্ধি-পত্রে স্বাক্ষর করেন। পরদিন সকালে যখন সেনাপতি সসৈন্যে নগরে প্রবেশ করলেন তখন বিস্ময়ের আর শেষ রইল না। থিয়ােডমির ও তার একান্ত অল্প কিছু সৈন্য ছাড়া আর কেউ নেই। তার পাশে কিছু বৃদ্ধমহিলা ও শিশু দপ্তায়মান। সেনাপতি জিজ্ঞাসা করলেন, "প্রাচীরের সামনে আপনার যে সৈন্যবাহিনী টহল দিচ্ছিল তারা কোথায়? উত্তরে থিয়ােডমির সব খুলে বললেন। পরে থিয়ােডমিরের এই কৌশলে অভিভুত হয়ে সেনাপতি মুগিস তাকে মুরসিয়ার গভর্নর পদে নিযুক্ত করেন। এজন্য মুরসিয়া প্রদেশ থিয়ােডমিরের নাম অনুসারে আরবিতে 'তুদমির নগর' বলেই অভিহিত হয়।

এভাবে রাজধানী টলেডাে ও মুরসিয়া পতনের পর মুসলিমবাহিনী প্রচুর ধন-রত্ন লাভ করেন। তারা একটি গীর্জা থেকে প্রায় ২৪টি মহামূল্যবান স্বর্ণের রাজমুকুট উদ্ধার করেন। স্পেনের রাজধানী টলেডাে বিজিত হওয়ার কারণে অন্যান্য অঞ্চল বিজয় করা বেশি কষ্টকর হবে না এই ভেবে মুসলমানদের আনন্দের সীমা রইল না।

এবার মুসলিম সেনাপতি বিজিত অঞ্চলগুলােতে সুষ্ঠু ইসলামি শাসন কায়েমের জন্য পদমর্যাদা ও যােগ্যতা অনুসারে গথিক রাজবংশীয়দেরকে শাসনকার্যে নিযুক্ত করেন। উইটিজার পুত্র অচিলাকে ইসলামি শাসনের প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য সাপেক্ষে টলেডাের পূর্বরাজ্য শাসনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। আর টলেডাের গভর্নর হিসেবে বিশপ অপাশকে এবং সিউটার গভর্নর হিসেবে কাউন্ট জুলিয়ানকে নিয়ােগ করেন। অন্যান্য অঞ্চলগুলােতে যােগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদেরকে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। এভাবে প্রায় অর্ধেক স্পেনে মুসলিম রাজত্ব বিস্তার হয়।

স্পেনের পথে মুসা বিন নুসায়ের

অন্য দিক দিয়ে মুসা বিন নুসায়েরও স্পেনের দিকে অগ্রসর হন। তিনি আরবদের সমন্বয়ে গঠিত আঠারাে হাজার সৈন্যের বাহিনী নিয়ে ৯৩ হিজরির রজব মাস মােতাবেক ৭১২ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে স্পেনে উপনীত হন। মুসা বিন নুসায়ের উত্তর পূর্ব দিক দিয়ে অগ্রসর হন। তিনি মেডিনা, সিডােনিয়া ও কারমােন দখল করেন। এরপর নিয়েবলা ও ওরলা বিজিত হয়। কয়েক মাস অবরুদ্ব রেখে সেভিল জয় করেন। বিজয়ীর বেশে মুসা বিন নুসায়ের টলেডাের নিকটবর্তী তারাভেরাতে প্রবেশ করেন এবং সেখানেই মুসা ও তারিক দুই বীর একত্রে মিলিত হন। সেনানায়ক তারিক আগ থেকেই সেনাপতি মুসাকে অভ্যর্থন জানানাের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই দুই বিখ্যাত বীরের মিলন আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টির বদলে দুঃখজনক ও করুণ দৃশ্যের অবতারণ করে। সেনাপতি মুসা বিন নুসায়ের তার আদেশ অমান্যের জন্য তারিককে বেত্রাঘাত করেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলাে প্রবল বিক্রমশালী তারিক বিন যিয়াদ সামরিক শৃঙ্খলার প্রতি নজিরবিহীন শ্রদ্ধা দেখিয়ে নীরবে সব শাস্তি মাথা পেতে নেন।তিনি চাইলে বিদ্রোহ করে নেতার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। ইসলামের মহান শিক্ষায় শিক্ষিত এই বীরের মনে সম্ভবত ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারুক রাদিআলাহু আনহু সেনাপতি খালিদ ইবনে ওলিদের ঘটনা জাগরুক ছিল।

যা-ই হােক এরপর তারা উভয়ে সম্মিলিতভাবে অভিযান পরিচালনা করেন এ অভিযানে সারগােসা, তারাগােনা, বার্সিলােনা, আন্তরিকা, লিওন, আমায়্যান, ওলেগিয়া পদানত হয়। অনধিক দুই বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ স্পেন মুসলমানদের হস্তগত হয়। উত্তরের পিরেনিজ পর্বতমালা পর্যন্ত এর সীমানা বিস্তৃত হয়। এরপর মুসা বিন নুসায়ের পিরেনিজ পর্বতমালার অপর প্রান্তে তথা ফ্রান্সের অভ্যন্তে অভিযান প্রেরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তিনি সেখানের গথিক শাসিত অঞ্চল লাংগােয়েডক এর কিছু অংশ দখল করেন। তার হাতে দ্রুত নারবােন এভিন ও লিয়ন এর পতন ঘটে। কিন্তু শেষের দুটি শহর ফ্রান্সের শাসক পেপিন পুনর্দখল করে নারবােন অবরােধ করে। তাই তখন ফ্রান্সের অভ্যন্তরে দখল বজায় রাখা মুসলমানদের জন্য সম্ভব হয়নি।

একটি শিলালিপি ...

এ দিকে ফ্রান্সের অভ্যন্তরে অভিযান পরিচালনা করার অনুমতি খলিফা ওলিদের পক্ষ থেকে ছিল না বিধায় মুসলমানরা রােন নদী অতিক্রম করেনি মুসলমানরা রােন নদীর তীরে আরবি ভাষায় উতকীর্ণ একটি শিলালিখি দেখতে পান তাতে লিখা ছিল- 'ইসমাঈলের সন্তানেরা আর অগ্রসর হয়ো না, ফিরে যাও। এ শিলালিপি দেখতে পেয়ে মুসলমানরা হতাশ হয়ে যায় ধারণা করা হয় এ শিলালিপি ফ্রান্সের শাসক পেপিন অথবা ওলিদের দূত মুগিস স্থাপন করেছিল।

সেনাপতি মুসা বিন নুসায়ের যখন ফ্রান্সের দক্ষিণ সীমান্ত থেকে ইউরােপ বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন তখন রাজধানী দামেস্ক থেকে তাকে রাজধানীতে প্রত্যাবর্তনে জরুরি নির্দেশ দেওয়া হয়। স্পেন ত্যাগের পূর্বে মুসা বিন নুসায়ের সদ্য বিজিত রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। স্পেন উমাইয়া খেলাফতের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। পরবর্তিতে মুসলমানরা মাত্র সাত বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ স্পেন দখল করেন।

সম্পর্কিত পাতাঃ
Powered by Blogger.