সুলতান আহমেদ সেনজার : সেলজুক সাম্রাজ্যের শেষ সুলতান

আহমেদ সেনজার ছিলেন খোরাসান এর বিখ্যাত সেলজুক সুলতান। ১০৯৫ সালে আহমেদ সেনজার খোরাসানের সিংহাসনে আরোহন করেন এবং ১১১৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান হয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। 


আহমেদ সেনজার এর বাল্যকাল নিয়ে তেমন কোন আলোচনা পাওয়া যায় না। জানা যায় তিনি ১০৮৬ সালে সিরিয়া এবং আল-জাজিরার সীমান্তবর্তী একটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় তার নামকরণ করা হয়েছিল জন্ম স্থানের নাম অনুসারে। কেননা তিনি যে শহরে জন্মগ্রহণ করেন তা ছিল ইরানের সিনজার নামক একটি শহর। সেনজার একটি তুর্কি শব্দ যার অর্থ ‘যিনি বিদীর্ণ করেন’ বা ‘ যিনি ছিন্ন করেন’।


১০৯৬ সালে তাকে তার ভাই মোহাম্মদ প্রথম (মোহাম্মদ তপার) এর সাথে খোরাসান এর দায়িত্ব দেয়া হয়। সে সময় সেলজুক সুলতান ছিলেন মোহাম্মাদ বারকিয়ারুক। খোরাসান একটি আঞ্চলিক প্রদেশ হওয়া সত্বেও আহমেদ শেহজাদ তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে শুরু করেন। এসময় সেলজুক রাজ্য অনেকটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। যার ফলে অনেক রাজ্যই স্বাধীনভাবে এ রাজ্য পরিচালনা করছিল। সেনজারের দূরদর্শিতা এবং পরিশ্রম সেলজুক ভুমিকে ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছিল একই সময় খোরাসান হয়ে উঠেছিল সেলজুক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি। পরবর্তী বছরগুলোতে আহমদ সেনজার ইরান এর বেশ কিছু অঞ্চল এবং নিশাপুরের একচ্ছত্র অধিপতিতে পরিণত হন।


সুলতান আহমেদ সেনজার, মালিক শাহ এর পুত্র আহমেদ সেনজার।
সুলতান আহমেদ সেনজার

এ সময় বেশ কয়েকজন শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তখনও ভাইদের মধ্যে সেলজুক সাম্রাজ্যের সিংহাসন নিয়ে লড়াই অব্যাহত ছিল। ১১০২ সালে, কাশগরীয়া তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে আহমেদ সেনজার তেমরেজ এর কাছে জিব্রাইল আরসালান খানকে হত্যা করেন। ১১০৭ সালে, আহমেদ সেঞ্জার ঘুড়ি রাজ্যের শাসক ইজ আদ-দ্বীন হোসাইনকে বন্দি করেন কিন্তু পরবর্তীতে আনুগত্যের শর্তে তাকে মুক্ত করে দেন।


এটা কারো অজানা নয় যে আততায়ীদের জন্য তখন ইসলামী বিশ্ব একটি রাত্রে শান্তিতে কাটাতে পারতাম। আততায়ীদের নেতা হাসান সাব্বাহ ইসলামকে ধ্বংসের এক নির্মম অভিযানে নেমে পড়েছিল। জানা যায়, তার হাতেই রাজ্যের শৃঙ্খলা বলে পরিচিত নিজামুল মুলক একটি গুপ্ত অভিযানে নিহত হন। কথিত আছে, মালিক শাহকেও হাসান সব্বাই এক বিশেষ ধরনের বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করে। এমন তারা জেরুজালেম বিজয়ী সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী বিরক্ত করতে ছাড়েনি। এবার আহমদ সেনজার এই হাসান সাব্বাহ নামক কাটাটিকে ইসলামিক দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য মনোনিবেশ করেন। তিনি হাশাশিনদের উচ্ছেদ করার জন্য বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এবং বেশ সফলতা অর্জন করেছিলেন। পারস্য থেকে হাশাশিন দের উচ্ছেদ করার জন্য তার এই প্রচারণা ছিল ইসলামী দুনিয়ায় এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তিনি কুইস্থান ও তাবাসা সহ বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দুর্গ থেকে শাশিনদের উচ্ছেদ করেন। উক্ত ঘটনাগুলো থেকে হাসান সাব্বাহ বুজতে পারে আহমেদ সেনজার এবার শাশিনদের কেন্দ্রীয় দুর্গ আলোতে অভিযান পরিচালনা করতে যাচ্ছেন। আলুতে অভিযানের পথে আহমেদ সেনজার একটি খোদাই-করা বার্তাবাহক খঞ্জর পান যাতে হাসান সাব্বাহ লিখেছিল সে শান্তি চায়। এ ঘটনায়, আহমেদ সেনজার কিছুটা অবাক হন কিন্তু তিনি হাসান সবার নিকট প্রেরণ করেছিলেন এবং তারা উভয়ে একে অপরের পর থেকেই দূরে থাকার শর্তে রাজি হয়েছিলেন।


১১০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আহমেদ সেনজার এর ভাই সুলতান বারকিয়ারুক মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে সুলতান বারকিয়ারুক তার ছোট সন্তান মইজুদ্দিন মালিক শাহকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেন। সেলজুক সাম্রাজ্যের নতুন সুলতান হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর মইজুদ্দিন মালিক শাহ নিজেকে মালিক শাহ (দ্বিতীয়) বলে ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন কিন্তু আসল ক্ষমতা ছিল তার চাচা মহাম্মদ তপারের হাতে। কয়েক বছরের মধ্যে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে গেলেন এবং মইজুদ্দিন মালিক বা দ্বিতীয় বাদশাহকে সিংহাসনচ্যুত করলেন এবং নিজেই পরবর্তী সুলতান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেন।


১১১৮ সালে যখন মোহাম্মদ তপার মারা যান তখন তার ছেলে মাহমুদ (দ্বিতীয়) নতুন সুলতান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এদিকে ইয়াজদ এর আমির গারশাপ দ্বিতীয় (আলি ইবনে ফারামুজ এর সন্তান। আলি ইবনে ফারামুজ ছিলেন ইয়াজদের আতাবেগ নামে বিখ্যাত) বিদ্রোহ করে বসেন। একই সাথে তিনি মাহমুদ দ্বিতীয় এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকেন। এসব কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে মাহমুদ তার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং তাকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। পরবর্তীতে সে সেখান থেকে পালিয়ে যায় এবং আহমেদ চেঞ্জার এর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করে। এদিকে সে সেনজারকে মাহমুদের বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে ইরানের কেন্দ্রে হামলা চালানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং সেই সব রকমের তথ্য দিয়ে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দেয়।


১১১৯ সালে সাভেহে আহমেদ সেনজার ও তার মিত্রবাহিনী মিলে সুলতান মাহমুদকে পরাজিত করে। এ অভিযানে সফলতা অর্জনের পর তিনি বাগদাদের দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানে তিনি মাহমুদ দ্বিতীয় এর সাথে তার কন্যাকে বিয়ে দিতে সম্মত হন। ফলে সে উত্তর পারস্যের কৌশলগত অঞ্চল নিজের অধীনে নিতে সক্ষম হয়। ১১৪১ সালে সেলজুক সাম্রাজ্যের জন্য বড় হুমকি কারা-খানিদদের বিরুদ্ধে এক্তি অভিযান পরিচালনা করেন। সেই কাতয়ান এর যুদ্ধে আহমেদ সেনজার এর বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং গারশাপ মারা যান। কথিত আছে মাত্র ১৫ জন ঘোরসওয়ার নিয়ে কোনরকমভাবে আহমেদ সেনজার পালিয়ে যান এবং পূর্বে সীর দরিয়ার সমস্ত সেলজুক ভুমি হাতছাড়া হয়ে যায়।


১১৫৩ সালে সেলজুক উপজাতিগুলোতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লে আহমেদ সেনজার এর সাথে সাথে সেলজুক রাজ্যও ভেঙ্গে পড়েছিল। ১১৫৭ সালে সুলতান আহমেদ সেনজার মারা যান এবং তাকে মেরভে সমাধিস্থ করা হয়। পরবর্তীতে মোঙ্গলরা ১১২১ সালে খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য আক্রমণ করার সময় তা ধ্বংস করে দিয়েছিল। সেনজারের মৃত্যুর অর্থ ছিল সাম্রাজ্য হিসেবে সেলজুক সাম্রাজ্যের সমাপ্তি কারণ তার উত্তরাধিকারীরা শুধু ইরান ও আজারবাইজানকেই নিয়ন্ত্রণ করেছিল।

Previous Post Next Post